বাংলাদেশের মেধাবী প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের জন্য বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন—এ বাস্তবতাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে দেশে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেছেন, “আমরা এখনো আমাদের মেধাবী প্রকৌশলীদের দেশে ধরে রাখতে পারছি না। পর্যাপ্ত গবেষণা, উদ্ভাবন ও উচ্চমানের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় তাঁরা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরে আয়োজিত জব ফেয়ার ও প্রজেক্ট কম্পিটিশন-২০২৬–এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘প্রকৌশলীরা দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ’ এই প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রকৌশলীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে প্রকৌশলীরা অন্যতম। তাঁদের মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।”
তবে তিনি মনে করেন, এই মানবসম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ একজন প্রকৌশলী তৈরি করতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময়, উন্নত অবকাঠামো, গবেষণাগার, দক্ষ শিক্ষক ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়।
“যখন একজন মেধাবী প্রকৌশলী বিদেশে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করেন, তখন সেই বিনিয়োগের পুরো সুফল দেশ পায় না,” বলেন তিনি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা যায়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মেধা পাচার রোধ এবং মেধাবী প্রকৌশলী ও গবেষকদের দেশে ধরে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। লক্ষ্য হলো, তাঁরা যেন দেশেই নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের সনামধন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থী সরকারি চাকরির পরিবর্তে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিচ্ছেন। ফলে রাষ্ট্র তাঁদের সর্বোচ্চ দক্ষতা সরাসরি কাজে লাগানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জব ফেয়ার শুধু চাকরি নয়, সংযোগেরও প্ল্যাটফর্ম
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইইবির প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)। তিনি বলেন, চাকরিপ্রার্থীরা যেমন কাজ খোঁজেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ ও যোগ্য জনবল খুঁজে থাকে। তাই চাকরিদাতার চাহিদা ও প্রার্থীর দক্ষতার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
তিনি বলেন, এবারের জব ফেয়ারে সিভি জমা দেওয়া প্রকৌশলীরা সম্ভাবনাময় এবং প্রজেক্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবনী সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন, যা দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, নতুন পাস করা প্রকৌশলীদের প্রথম কর্মসংস্থান সহজতর করা এবং তাঁদের পেশাগত ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন।
৩৭ প্রতিষ্ঠান, ৫০০ সিভি, তাৎক্ষণিক নিয়োগও
আইইবির তথ্য অনুযায়ী, এবারের জব ফেয়ারে দেশের ৩৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। প্রায় ৫০০ প্রকৌশলী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিভি জমা দেন। এর মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার নেয় এবং কিছু প্রার্থীকে সরাসরি নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। আরও অনেককে ভবিষ্যৎ নিয়োগের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়েছে।
জব ফেয়ার ও প্রজেক্ট কম্পিটিশন ব্যবস্থাপনা উপ-কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, এ আয়োজন প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিকাশেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
প্রজেক্ট কম্পিটিশনে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩টি দল অংশ নেয়। বিচারকদের মূল্যায়নে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম, কুয়েট দ্বিতীয় এবং চুয়েট তৃতীয় স্থান অর্জন করে। আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ হয় এবং এমআইএসটি ও বিএইউ যৌথভাবে পঞ্চম স্থান অর্জন করে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে দেশের প্রকৌশল খাতের একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা—মেধাবী প্রকৌশলীদের বিদেশমুখিতা। আইইবির এই জব ফেয়ার চাকরি ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগ দিলেও, দেশে গবেষণা ও উচ্চমানের প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান কতটা বাড়ানো যায়, সেটিই হয়তো নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে এই মেধা দেশে রাখা সম্ভব হবে কি না।