বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম একটি গুরুতর সামাজিক ও মানবাধিকার সমস্যা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এসব শিশু নির্মাণ কাজ, ওয়ার্কশপ, পরিবহন, কৃষি, গৃহকর্ম, বর্জ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক পেশায় কাজ করছে। এর ফলে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ হারাচ্ছে। এতে ব্যক্তি, পরিবার ও জাতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে “ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি” শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ইয়ং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট, রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট (ওয়াইডব্লিউডিআরসি) এবং নারী উন্নয়ন শক্তি (এনইউএস)।
অনুষ্ঠানটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এবং ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াইডব্লিউডিআরসি-এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ। তিনি বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সামাজিক বৈষম্য শিশুশ্রম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক সহায়তা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন। তিনি বলেন, শিশুশ্রম নির্মূল শুধু শ্রম খাতের বিষয় নয়, এটি শিশু অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে জড়িত। তাই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক নেতা, টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুল হোসেন। তিনি বলেন, শ্রমজীবী পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ছাড়া শিশুশ্রম নির্মূল সম্ভব নয়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক খায়রুজ্জামান কামাল, ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নাসিমা হক, নারী উন্নয়ন শক্তির অভিবাসন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ আনিসুর রহমান এবং ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী সদস্য আব্দুল মমিন। সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে বক্তব্য রাখেন হাসি আক্তার। তিনি বলেন, চরম দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে অনেক পরিবার শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়। পরিবারগুলোর জন্য আয়বর্ধক কর্মসংস্থান ও সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সভা থেকে সরকারের প্রতি উত্থাপিত দাবিসমূহ
১। জাতীয় বাজেটে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য পৃথক ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
২। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের সনাক্তকরণ, উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পরিবারে পুনঃএকত্রীকরণের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে।
৩। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে।
৪। শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে।
৫। কিশোর-কিশোরীদের জন্য বাজার উপযোগী কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৬। শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭। গৃহকর্ম, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে হবে।
৮। জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসনপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
৯। শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও শিশু অধিকার বিষয়ে জাতীয় সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।
১০। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, শ্রমিক সংগঠন ও শিশু অধিকার সংগঠনসমূহকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
বক্তারা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূল করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। তাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে শিশুশ্রম প্রতিরোধ, শিক্ষা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।