প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় এই দিবসটি। ক্যান্সার সচেতনতা এবং গবেষণার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে এটি উদযাপন করা হয়।ক্যান্সার—শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মন দমে যায়। এটি শুধু শারীরিক রোগ নয়, বরং মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিরাট প্রভাব ফেলে। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ এই রোগের সঙ্গে লড়াই করেন, এবং তাদের পরিবারও এই যুদ্ধে যুক্ত থাকে। ক্যান্সার শুধুমাত্র রোগীর জীবন নয়, পুরো পরিবার ও সমাজের জন্য এক চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা একা নই। “স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার ডে” হল সেই দিন, যখন সমগ্র বিশ্ব একযোগে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং গবেষণাকে উৎসাহ দেয়।
> স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার ডে কী?
স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলন, যা ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো ক্যান্সারের বিরুদ্ধে গবেষণা ও চিকিৎসা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। আর বিজ্ঞানী, গবেষক, রোগী এবং সাধারণ মানুষকে একত্রিত করে ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য কাজ করে।
প্রতিবছর এই দিনটিকে বিশ্বব্যাপী উদযাপন করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে ক্যান্সার সচেতনতা বাড়াতে উৎসাহিত করা হয়। এর মাধ্যমে ক্যান্সার নিয়ে মিথ্যাচার ও ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করা হয় এবং প্রাথমিক নিরীক্ষণ ও চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝানো হয়।
কেন এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ?
ক্যান্সার একটি জটিল এবং প্রাণঘাতী রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২.০৪ কোটি নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয় এবং প্রায় ০.৯৭ কোটি মানুষ মারা যায়। ক্যান্সারের কারণে মৃত্যু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক নিরীক্ষণ, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং উন্নত চিকিৎসা।
> বাংলাদেশে ২০২৪–২০২৫ সালের পরিসংখ্যান: – নতুন ক্যান্সার রোগী: প্রায় ১,৭০,০০০ জন * মৃত্যুহার: প্রায় ১,২০,০০০ জন * সাধারণ ক্যান্সার (পুরুষ): গলা, ফুসফুস, লিভার * সাধারণ ক্যান্সার (মহিলা): স্তন, জরায়ু * বাংলাদেশে প্রায় ৪০ ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত।সবচেয়ে সাধারণ ক্যান্সার: স্তন, ফুসফুস, কলোরেক্টাল, প্রোস্টেট।প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন জীবদ্দশায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
> ক্যান্সারের প্রধান ধরন
১. কারসিনোমা: অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক লাইনিং কোষ থেকে শুরু, যেমন স্তন, ফুসফুস, কোলন
২. সারকোমা: সংযোগকারী টিস্যু, হাড়, পেশী বা রক্তনালী
৩. লিউকেমিয়া: রক্ত ও হাড়ের মজ্জার ক্যান্সার
৪. লিম্ফোমা ও মায়েলোমা: লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম ও প্লাজমা কোষের ক্যান্সার
৫. সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ক্যান্সার: মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের ক্যান্সার
> রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
* বায়োপসি: টিস্যু নমুনা পরীক্ষা করে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করা
* ইমেজিং টেস্ট: এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, পিট স্ক্যান
* ল্যাব টেস্ট: রক্ত, প্রস্রাব বা অন্যান্য তরল পরীক্ষা
* জেনেটিক টেস্টিং: জিন পরিবর্তন ও ঝুঁকি শনাক্তকরণ
> ক্যান্সারের এলোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি
* সার্জারি: টিউমার অপসারণ * কেমোথেরাপি: কেমিক্যাল ওষুধ ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস
* রেডিয়েশন থেরাপি: উচ্চ শক্তির রেডিয়েশন দিয়ে টিউমার shrink বা ধ্বংস করা
* ইমিউনোথেরাপি: রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস
* টার্গেটেড থেরাপি: নির্দিষ্ট জিন বা প্রোটিন লক্ষ্য করে চিকিৎসা
* স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট: হাড়ের মজ্জা প্রতিস্থাপন
> ক্যান্সারের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি
হোমিওপ্যাথি ক্যান্সার রোগীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক। অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসক গন প্রাথমিকভাবে যেই সব ঔষধ লক্ষণের উপর নির্বাচন করে থাকে :- কারসিনোসিন – টিউমার ও ক্যান্সার রোগীর মানসিক চাপ ও হতাশা কমাতে৷ কোনিয়াম ম্যাকুলাটাম – স্তন ও লিম্ফ্যাটিক ক্যান্সারের রোগীর জন্য। ফাইটোলাকা – স্তন ক্যান্সারে সহায়ক। থুজা অক্সিডেন্টালিস – ক্যান্সারের জন্য সাধারণ ইমিউনোথেরাপি সহায়ক। আর্সেনিকাম অ্যালবাম – দুর্বল রোগী ও ক্লান্তি কমাতে। চেলিডোনিয়াম – লিভার ও গ্যলব্লাডার ক্যান্সার সহায়ক
সাবিনা – গাইনোকলজিক্যাল ক্যান্সারের সহায়ক। ইগনেশিয়া – মানসিক চাপ ও উদ্বেগ হ্রাসে।বেলাডোনা – হঠাৎ জ্বর বা প্রদাহজনিত সমস্যা হ্রাসে।ফসফরাস– ফুসফুস ও রক্তসংক্রান্ত ক্যান্সারের রোগীর জন্য সহায়ক সহ
আরো অনেক ঔষধ লক্ষণের উপর আসতে পারে তাই ঔষধ নিজে নিজে ব্যবহার না করে বিশেষজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করুন। মনে রাখতে হবে হোমিওপ্যাথির লক্ষ্য রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাস।মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানো আর রোগীর জীবনমান উন্নত করা।
> ক্যান্সারের জটিলতা
* ইনফেকশন: ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হওয়ার কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধি
* অ্যনিমিয়া: রক্তের অপ্রচুরতা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা
* পেইন: টিউমার বা চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
* নিউরোপ্যাথি: স্নায়ুর ক্ষতি, বিশেষ করে কেমোথেরাপি থেকে
* মানসিক প্রভাব: উদ্বেগ, বিষণ্নতা, হতাশা
> ক্যান্সার সচেতনতা ও প্রতিরোধ
* সুষম খাদ্য: প্রচুর শাক-সবজি, ফল, প্রোটিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত খাবার
* নিয়মিত ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট
* ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়ানো
* নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ
* প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা
পরিশেষে বলতে চাই, স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার ডে” কেবল একটি দিবস নয়; এটি একটি আন্দোলন, যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একত্রিত সমাজের প্রতিফলন। এই দিনে আমরা রোগীদের পাশে দাঁড়াই, সচেতনতা তৈরি করি এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন আশা সৃষ্টি করি।সচেতনতা, প্রাথমিক নিরীক্ষণ, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, আধুনিক চিকিৎসা ও হোমিওপ্যাথি সহায়ক ব্যবস্থা একসাথে কাজে লাগালে রোগ প্রতিরোধে কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।প্রত্যেকের উচিত এই দিনে “স্ট্যান্ড আপ” করা—ক্যান্সারের বিরুদ্ধে, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, হতাশার বিরুদ্ধে। একযোগে লড়াই করলে ক্যান্সারের মতো রোগও পরাস্ত হতে বাধ্য। স্ট্যান্ড আপ টু ক্যান্সার ডে—একটি বিশ্বব্যাপী আহ্বান, এক সম্মিলিত লড়াই, এক নতুন আশা।
লেখক, চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি