আজ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ নারী উন্নয়ন শক্তির আয়োজনে সংস্থার রামপুরা কার্যালয়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের সুষ্ঠ বিচারের দাবিতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। খিলগাঁও এলাকার সুবিধা বঞ্চিত নারীদের নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সহায়তা করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস এন্ড ক্লাইমেট ও ফোরাম ফর কালচার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট। সভার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ও সভার সভাপতি ডঃ আফরোজা পারভীন। তিনি তার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় বলেন, বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা দিনে দিনে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউ এইজ পত্রিকার খবর অনুসারে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট প্রায় ৭,০৬৮টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫,৫৭০ অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ জন নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ঢাকা ট্রিবিউন এর প্রতিবেদন মোতাবেক গ্যাং রেপ: ১৭৯টি ঘটনা ধর্ষণের চেষ্টা: ১৮৮টি ঘটনা, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা: ৭ জন ও যৌন হয়রানি: ১৬৯টি ঘটনা।
ইউনিসেফ উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বড় অংশই পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কার, সামাজিক প্রভাব ও বিচারহীনতার কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশই পায় না।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিচারহীনতা, সামাজিক নীরবতা, কুসংস্কার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার—এই চারটি প্রধান কারণ এই অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে দায়ী। সাম্প্রতিক একটী নৃশংস ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন চাঁদপুর, ফরিদগঞ্জে চার বছর বয়সী এক শিশুকে বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে ঘরে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় এক মসজিদের মুয়াজ্জিন কর্তৃক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। শিশুটি গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। অভিযুক্তকে আটক করা হলেও এই ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সহ-সভাপতি জনাব খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, নোয়াখালী, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সুবর্ণচরে এক কিশোরীকে ‘জ্বীন-ভূতের আছর’ আছে বলে প্রতারণা করে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক একা পেয়ে যৌন নির্যাতন করে। পরে ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং মামলা করার পর পরিবারকে হামলা ও অগ্নিসংযোগের হুমকি দেওয়া হয়। এখনো পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত।
ইয়ং উইম্যান ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস এন্ড ক্লাইমেট এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ বলেন, “এই ঘটনাগুলো আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য লজ্জাজনক। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে উন্নয়নের কোনো অর্থ থাকে না। বিচারহীনতার কারণে নির্যাতন দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।” ফোরাম ফোর কালচার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের সভাপতি সাহিদা ওয়াহাব বলেন, “কুসংস্কার ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না করলে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে না।”
টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, “সমাজকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, একই সাথে সুষ্ঠু বিচারের জন্য সরকারের প্রশাসনিক নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে।” শিলিড-এর প্রচার সম্পাদক সেলিনা খাতুন বলেন, “নারী ও শিশু যেকোনো ধরনের নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।” সুবিধা বঞ্চিত নারীদের পক্ষ থেকে তহুরা খাতুন বলেন, “ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন অত্যন্ত জরুরি।”
সুবিধা বঞ্চিত নারীদের অংশগ্রহণে এই সভায় সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন: নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ধর্মীয়, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কুসংস্কার ও ভণ্ড চিকিৎসার নামে প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
সভার সকলে যে সকল দাবিসমূহ উত্থাপন করেন সেগুলো হল: অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন, সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন, ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলা ও হুমকির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় করা। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।