আজ ১৬ই মে ২০২৬ বায়ু দূষণ রোধে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইট এন্ড ক্লাইমেট খিলগাঁও এলাকায় তিন দিন ব্যাপী ক্লিন এয়ার কম্পেইনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান এর আয়োজন করে। সংস্থার বনশ্রী রামপুরা ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত “ক্লিন এয়ার হেলদি ফিউচার” এই শিরোনামে ক্যাম্পেইনটিতে ওয়াই ডাব্লিউ ডি আর সি এর এই কার্যক্রমের সহায়তা করে নারী উন্নয়ন শক্তি, বাংলাদেশী অধিকার ফোরাম ও টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ও কি নোট পেপার প্রেজেন্ট করেন সংস্থার এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ। তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে বিশ্বের ৯৯% মানুষ দূষিত বাতাসের মধ্যে বসবাস করছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০২০ -২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স প্রতি ১০. বাড়লে শ্বাসতন্ত্র জনিত হাসপাতালে রোগী ভর্তি ৩.৮% এর চেয়ে বেশি অর্থাৎ পিএম ২.৫ মাত্রা বাড়লে ৫.২% পর্যন্ত রোগী ভর্তি বৃদ্ধি পায় যা নিরাপদ সীমার কয়েক গুণ বেশি। এই কারণে পাঁচ বছরের নিচে শিশু এবং 60 বছরের উর্ধ্বের বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি হাঁপানি, একিউট অ্যাজমা, নিউমোনিয়া, ফুসফুস ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, চোখ জ্বালা, এলার্জি এমনকি শিশুদের ফুসফুস বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়।
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বায়ু দূষণ জনিত কারণে রোগগ্রস্ত হয়ে মারা যায়। ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর একটি এবং অনেক দিনই ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ১৫০-৩০০ এর মধ্যে থাকে যা অস্বাস্থ্যকর থেকে খুব ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ২০০ এর উপরে গেলে শিশু গর্ভবতী নারী বৃদ্ধ ও হাঁপানি রোগীদের জন্য ফকির পরিমাণ বেড়ে যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কারস ফেডারেশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নারী উন্নয়ন শক্তি নির্বাহী পরিচালক ডঃ আফরোজা পারভীন, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সহ-সভাপতি জনাব খায়রুজ্জামাল কামাল, ফোরাম কালচার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী সদস্য জনাব আব্দুল মোমেন ও ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক সেলিনা খাতুন। বক্তারা সকলেই বলেন যে আমাদের ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে বায়ু দূষণ এখন জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের বড় সংকট। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো পক্ষ থেকে সরকারের কাছে নিচের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়-
১. সরকারকে জাতীয় “ক্লিন এয়ার অ্যাকশন প্ল্যান” তৈরি ও দ্রুততম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে যেখানে দূষণ কমানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা থাকবে, এর জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করতে হবে ও নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।
২. পুরনো দূষণকারী ও অবৈধ ইটভাটা ধাপে ধাপে বন্ধ করতে হবে এবং জিগজাগ আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে, স্কুল ও আবাসিক এলাকার কাছে ইটভাটা নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বিকল্প পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী প্রচারণা করতে হবে।
৩. ফিটনেসবিহীন পরিবেশ দূষণকারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পুরনো বাস-ট্রাক ধাপে ধাপে বন্ধ করতে হবে। বাধ্যতামূলক এমিশন টেস্ট করতে হবে ও ধোঁয়া মুক্ত করতে গণপরিবহন উন্নত করতে হবে।
৪. শিল্পকারখানায় পরিবেশ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। সকল কারখানায় এয়ার ফিল্টার ও ইটিপি বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়মিত পরিবেশ অডিট ও দূষণকারী শিল্পের বিরুদ্ধে জরিমানা ও লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করতে হবে। শিল্প এলাকায় এয়ার মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে।
৫. নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্মাণস্থল ঢেকে কাজ করা ও নির্মাণ এলাকায় নিয়মিত পানি ছিটানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। খোলা ট্রাকে বালু/মাটি পরিবহন নিষিদ্ধ করতে হবে।
৬. খোলা জায়গায় আবর্জনা ও প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধ করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার প্রকল্প গ্রহণ ও ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. শহরে ব্যাপক বৃক্ষরোপণের জন্য আরবান ফরেস্ট্রি প্রোগ্রাম জোরদার করতে হবে। এর মাধ্যমে রাস্তার পাশে ও স্কুলে খোলা মাঠে খালের পাড়ে, গাছ লাগানো, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান, পাহাড়, মাঠ, সংরক্ষণ আইনে যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৮. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক পরিবেশ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং পাঠ্য পুস্তকে পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরাবেশ ক্লাব গঠনের মাধ্যমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযান, বৃক্ষরোপণ ও বায়ু দূষণ সচেতনতার প্রসার করতে হবে।
৯. রিয়েল-টাইম এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং এর জন্য প্রতিটি বড় শহরে এয়ার কোয়ালিটি মনিটর স্থাপন করে মোবাইল অ্যাপ ও ডিসপ্লে বোর্ডে এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডিকেটর প্রকাশ করে হবে এবং জনগণকে মোবাইলের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতার নিউজ দিতে হবে স্বাস্থ্য সতর্কতা প্রদান করতে হবে।
১০. পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি অর্থাৎ সৌরশক্তি ব্যবহারে সরকারকে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং সরকারি ভবনে রিনিউয়াবল এনার্জি বাধ্যতামূলক করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।
১১. স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে দূষণপ্রবণ এলাকায় ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
১২. পরিবেশ নীতির বাস্তবায়নে স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে জনসচেতনতা ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম হাতে নিতে হবে এবং বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন করতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে পরিবেশ কমিটি গঠন করে যুব সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করে পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত করতে হবে।
13. উপরোক্ত সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের বন পরিবেশ ও ক্লাইমেট চেন্জ মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।