★ হারানো আসন পুনরুদ্ধারে বিএনপির ভরসা ‘ব্র্যান্ড’ কায়কোবাদ
★ তরুণ নেতৃত্বের হাতছানি উপদেষ্টা আসিফের সিদ্ধান্তের উপর
★ প্রার্থীতা নিশ্চিত থাকায় প্রচারণায় এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী
★ জনসমর্থন জোগাতে ব্যস্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
★ প্রচারণায় নিষ্ক্রিয় অবস্থানে গণ অধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টি
অন্তবর্তী সরকারের অধীনে সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে রাজনৈতিক উত্তাপ। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলোর অনেকটাই নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে এবার মাঠে নামতে প্রস্তুত বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র ঘরানার একাধিক প্রার্থী। নির্বাচনী আলোচনায় ইতোমধ্যেই চারটি নাম ঘুরপাক খাচ্ছে, যারা নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান ও জনভিত্তি নিয়ে আসন্ন লড়াইয়ে ঝাঁপাতে প্রস্তুত।
প্রতিবাদী রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে মুরাদনগরে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী দলটির কেন্দ্রীয় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কাজী শাহ্ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। মুরাদনগরের রাজনীতিতে কায়কোবাদ নিজের নামকে ইতোমধ্যেই পরিণত করেছেন একটি ব্যান্ড হিসেবে। যিনি একসময় স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। সৈরাচার হাসিনার অবৈধ নির্বাচনে কায়কোবাদের ঘাঁটিখ্যাত কুমিল্লা-৩ আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের হাতে। পরবর্তীতে, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তাকে সরিয়ে রাখা হয় স্থানীয় রাজনীতি হতে। এবারের নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ ঘিরে বিএনপির ঘাঁটিতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখায় তার প্রতি সকলের অবিরাম ভালোবাসা লক্ষ্য করা গিয়েছে। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন মুরাদনগর উপজেলার লাখো মানুষ বিমানবন্দরে ভীড় জমিয়েছিল।
জুলাই যোদ্ধা ও অন্তবর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন করবেন বলে একবার জানিয়েছিলেন তার বাবা। তবে সরকারের গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে এখনো রয়েছে ধোঁয়াশা। তারুণ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে সজীব মুরাদনগরের নতুন প্রজন্মের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ও সংস্কার করাচ্ছেন তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি উপদেষ্টা আসিফ পদত্যাগ করে এনসিপির হয়ে নির্বাচন করেন তাহলে তিনি হতে পারেন বড় চমক।
বিএনপির প্রার্থী কায়কোবাদ ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সমর্থকদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে চলছে চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও মামলা। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের পদত্যাগ দাবিতে একাধিকবার আন্দোলন করেছে কলেজ শিক্ষার্থী, বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। পাল্টা হিসেবে প্রতিবারই আন্দোলনের প্রতিবাদ মিছিল বের করেছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আ›োলন ও এনসিপির নেতৃবৃন্দ। এছাড়া বিগত দিনগুলোতে উভয়দল একই সময়ে পাশাপাশি স্থানে কর্মীসমাবেশ ডাকায় জনগণের মাঝে উত্তাপ ছড়াতে দেখা গেছে।
মুরাদনগরে এবার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ইসলামী শক্তিগুলোও। বিএনপির মতো বিশাল জনসমর্থন রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত প্রার্থী হলেন, বুড়িচং উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য ইউসুফ হাকিম সোহেল। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় এবং তৃণমূলে একটি সুসংবদ্ধ কাঠামো গড়ে তুলেছেন। সাবেক মুরাদনগর উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় জনগণের সাথে রয়েছে তার গভীর সম্পৃক্ততা। অন্যসকল দলের পূর্বেই প্রার্থীতা নিশ্চিত হওয়ায় জামায়াতের প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে মুরাদনগরে একটি বিশ্বাসভিত্তিক ভোট ব্যাংক তৈরির চেষ্টায় রয়েছেন। তিনি কর্মীদের নিয়ে জনগণের সমর্থন আদায়ে ছুটছেন ভোটারদের দোরগোড়ায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় রাজনীতির গতিপথের ওপর নির্ভর করছে মুরাদনগরের ভাগ্য। গণ অধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির মতো দুইটি বড় রাজনৈতিক দল মাঝেমধ্যে মিটিং আয়োজন করলেও মুরাদনগরে প্রচারণায় অনেকটা নিষ্ক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। যদি বিরোধী জোট নির্বাচনে অংশ নেয়, তবে মুরাদনগরে তীব্র প্রতিদ্বিদ্বতামূলক নির্বাচন হতে পারে। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র ও ইসলামি দলগুলো যদি সুষ্ঠুভাবে মাঠে থাকে, তবে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা চূড়ান্ত ফলকে নাটকীয় করে তুলতে পারে।
মুরাদনগরের সাধারণ ভোটাররা বলছেন, “আমরা মুখ না, কাজ চাই। যে এলাকার উন্নয়ন করবে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দিকটায় নজর দেবে, তাকেই ভোট দেব।” এমন মনোভাবেই স্পষ্ট মুরাদনগরের মানুষ এবার চায় উন্নয়নমুখী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতৃত্ব।
মুরাদনগর আসনে এবার যে রাজনীতির ছবি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো প্রচলিত বনাম উদীয়মান নেতৃত্ব, ধর্মীয় ধারার আধিপত্য চেষ্টার সাথে প্রথাগত দলীয় ক্ষমতার সংগ্রাম। নির্বাচন অবাধ ও প্রতিদ্বিদ্বতাপূর্ণ হলে, এটি হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় আসনগুলোর একটি।