জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা ও বর্তমান কর কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ সরকারি চাকরি জীবনে কর প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে প্রভাব খাটিয়ে এবং অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২২তম বিসিএস (কর) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ফখরুল ইসলাম। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন কর অঞ্চলে সহকারী কর কমিশনার, উপ-কর কমিশনার, যুগ্ম কর কমিশনার ও অতিরিক্ত কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একসময় আওয়ামী পন্থী কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া এ কর্মকর্তা ক্ষমতার পালাবদলে বনে যান বিএনপি পন্থী। বর্তমানে তিনি খুলনা কর আপিলাত ট্রাইব্যুনালের সদস্য (কর কমিশনার) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। নিজেকে বিএনপিপন্থী পরিচয় দিয়ে কমিশনার হিসেবে পদোন্নতিটিও বাগিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কর ফাইল নিষ্পত্তি, করদাতাদের বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং হয়রানি থেকে অব্যাহতির সুযোগ করে দিয়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুরের সেকশন-১২, ব্লক-বি, ২ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘ডিসি সাহেবের বাড়ি’ নামে পরিচিত এলাকায় মূল্যবান জমির ওপর গড়ে ওঠা একাধিক বহুতল ভবনের মালিকানা রয়েছে তার পরিবারের নামে। এর মধ্যে হোল্ডিং নম্বর-২৫ এ অবস্থিত ‘শান্তির নীড়’ নামের ভবনে দুটি অভিজাত ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া একই এলাকার হোল্ডিং নম্বর-১৫ এ অবস্থিত একটি পাঁচতলা ভবনেও একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকানা তার বা তার পরিবারের সদস্যদের রয়েছে বলে অভিযোগ। মিরপুর ১২ নম্বর সি ব্লকের নয় ও দশ নম্বর রোডে তার পরিবারের সদস্যদের নামে আরো দুটি বাড়ি রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে গুলশান ডিসিসি মার্কেটে বিশাল একটি লাগেজের দোকান রয়েছে পরিবারের সদস্যদের নামে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে আত্মীয়-স্বজন, ভাই ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ও নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন এলাকায় জমি, প্লট, বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে তারা দাবি করেন। এছাড়া তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি থাকার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন কর প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকে পুঁজি করেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন বা দৃশ্যমান সরকারি তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা চললেও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কর কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের জন্য আইন অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করতে পারে। তবে অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর তদন্ত দৃশ্যমান না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুর্নীতি দমন আইন এবং সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।