সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রতি বছরের মতো এবারেও জমজমাটভাবে হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের মেলা বা জামাইবরণ মেলা। উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারে কয়েক ‘শ বছরের পুরাতন এ মেলা জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রোববার শুরু হয়। চলে পরের দিন সোমবার পর্যন্ত। তবে বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের আসা-যাওয়া চলে সপ্তাহজুড়ে।
গতকাল রোববার বিকেলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মেলায় আসা মানুষজন কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
নিমগাছী, দত্তবাড়ি, বাঁশাইলসহ বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায় বিষয়টি। যশোরের সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম কলেজ) কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান খ ম রেজাউল করিম লিখিত রায়গঞ্জ: ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ মেলা হয়ে আসছে বলে কথিত রয়েছে। এ মেলা হয় একটি বিশেষ বাঁশকে কেন্দ্র করে। অনেক আগে থেকে এখানকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ওরাঁও এবং মাহাতোসহ নানা নৃ- তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বাঁশকে দেবতা মনে করে পূজা করতো। মেলা শুরুর সপ্তাহখানেক আগে থেকে গ্রামে গ্রামে চলে মাদারের বাঁশের মেলা। একটি বড় বাঁশকে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে ও নানা রংয়ে সাজিয়ে ১৫-২০ জনের একটি দল বেরিয়ে পড়ে। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লাঠি খেলা দেখায় তারা।
এ মেলা ঘিরে গ্রামে গ্রামে চলে আনন্দ-উৎসব। এলাকার প্রতিটি বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনেরা আসেন। চলে খাওয়া-দাওয়া। বিশেষ করে জামাই-ঝি নিয়ে আসা হয় বাড়িতে বাড়িতে। শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইকে নানা উপহার ও নগদ টাকা দেয়া হয়। জামাইও মেলায় গিয়ে মাছ আর মিষ্টি কিনে আনে শ্বশুরবাড়িতে। তাই কেউ কেউ এ মেলার নাম দিয়েছেন জামাইবরণ মেলা।
মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার লেখক ও গবেষক উজ্জল কুমার মাহাতো রচিত উপন্যাস কারাম ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষায় দ্বিতীয় এবং কুড়মালি ভাষার প্রথম উপন্যাস।
এখানে এই মেলার সুন্দর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। এই মেলার পূর্বে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মহিলারা এক ধরনের শক্ত মাটি সংগ্রহ করেন সেটা পানিতে ভিজিয়ে রেখে স্নানের সময় মাথার চুল পরিষ্কারের কাজে শ্যাম্পুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন।
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গনদিয়া মাহাতো ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বাঁশের মেলায় যায়। বাবার সাথে ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে পুতুল দেখার জন্য গনদিয়া পিছনে পড়ে এবং হারিয়ে যায়। পরে প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হয়, শেষে বাবা মেয়েকে খুঁজে পাই এবং পছন্দের জিনিসগুলো কিনে গনদিয়া বাবার হাত ধরে বাড়ি ফেরে।
স্থানীয় প্রবীণ সাংবাদিক ও কবি আবদুল কুদ্দুস তালুকদার বলেন, লোকমুখে শুনেছি গাজী – কালু – চম্পাবতীর কাহিনী স্মরণে প্রতি বছর এই মেলা বসে। জানা যায়, গাজী সাহা যুদ্ধের মাধ্যমে চম্পাবতির বাবাকে পরাজিত করে তাকে বিয়ে করেন। সেই উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছর মেলার আয়োজন হয়। এজন্য বড় বাঁশে কাপড় পেঁচিয়ে এবং নানাভাবে তা অলংকৃত করে মেলার দিন প্রদর্শন করা হতো। যাকে বলা হতো মাদার বাঁশ। নানান গ্রাম থেকে বাঁশ আসতো। যাদেরটা বড় এবং অলংকৃত বেশি তারা পুরস্কৃত হতেন মেলা কমিটি থেকে। মেলার কয়েকদিন আগে থেকে ঐ বাঁশ কাঁধে নিয়ে আশেপাশের গ্রামে ঢাক – ঢোল বাজিয়ে একদল লোক সাহায্য প্রার্থনা করতো। ওরা ছুরি, লাঠি দিয়ে বিভিন্ন কসরত প্রদর্শন করতো।
লোকে চাল, টাকা – পয়সা ইত্যাদি দিয়ে ওদের সাহায্য করতো তথা এলাকার কালচারকে জীবিত রাখতে অবদান রাখতো। কালের বিবর্তনে বড় বাঁশ তথা মাদার বাঁশ উত্তোলন বন্ধ হলেও কসরত দেখিয়ে সাহায্য তোলা আজও চলছে। তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের দত্তবাড়ি গ্রামের নিহার রঞ্জন সরকার বলেন, এ মেলাকে ঘিরে এলাকা সরগরম হয়ে উঠেছে। আগামীকাল (আজ সোমবার) বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনরা চলে আসবে বলে জানান তিনি। কাঞ্চনেশ্বর গ্রামের জয়দেব চন্দ্র মাহাতো বলেন, ধান কাটা ও মাড়াই শেষে এ মেলা হয় বলে আনন্দের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।
নিমগাছী কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, বলা হয়ে থাকে বাঙালি হিন্দুদের বারো মাসে তের পার্বণ। আদিবাসী হিন্দুদের বছরে পার্বণের সংখ্যা আরো বেশি। ধান কাটা শেষে এলাকার মানুষ উৎসবে মেতে উঠে। এটি বছরের একটি বড় উৎসব বলে জানান তিনি। মাহাতো জনগোষ্ঠীর কুড়মালি ভাষার লেখক উজ্জল কুমার মাহাতো বলেন, বাঁশের মেলা বা মাদারের মেলা বা জামাইবরণ মেলা যে নামেই ডাকা হোক না কেন এ মেলা সবাইকে একত্রিত করে।
মেলায় আসা শ্যামেরঘোন গ্রামের হীরেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, এ মেলায় না এসে পারা যায় না। পশ্চিম আটঘড়িয়া গ্রামের ঝুমুর গানের শিল্পী উপেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, ঐতিহ্যের এ মেলা এখন সবার উৎসবের উপলক্ষ হয়ে গেছে।