দুগ্ধ সমৃদ্ধ পাবনা জেলায় আবহমান খাদ্য সংস্কৃতিতে ঘোল মাঠার এক চিরন্তন আবেদন রয়েছে। সারাবছর মানুষের কাছে একদিকে যেমন হজম সহায়ক অন্যদিকে প্রশান্তি দায়ক ঠান্ডা পানীয় হিসেবে ঘোল- মাঠা খুব জনপ্রিয় খাবার।
পাবনার বেড়া উপজেলার মাঠার চাহিদা সারা বছরই তুলনামূলক ভাবে থাকে, তবে রমজান মাস এলে এর চাহিদা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। পাশাপাশি দামও বাড়ে বেশ, ব্যবসায়ীরা বলছেন গতবারের চেয়ে এ বছর বিক্রি কম তাই স্বল্প লাভে ঘোল-মাঠা বিক্রি করছেন তারা। এই জনপদে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ ঘোল- মাঠা জেলা ছাড়াও মাঠার স্বাদ নিচ্ছেন দেশের নানা জায়গার মানুষ। এই পানীয় বিক্রি করে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জীবন-জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন। রোজার প্রথম দিন থেকেই গ্রাম কিংবা শহরের ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত ও প্রসিদ্ধ দই মিষ্টির দোকানগুলোতে প্লাস্টিকের বোতল ও হাঁড়িতে ঘোল – মাঠা সাজিয়ে বিক্রি করছেন ছোট-বড় অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বড় বড় পাতিল এবং বালতি ভরে মাঠা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘকাল ধরে শরবতের পরিবর্তে রমজান মাসে মাঠাকে প্রাধান্য দিয়ে আসছেন। সকলের ধারণা দেশের অন্যন্য এলাকার চেয়ে বেড়ার মাঠা স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। আমরা জানি ঘোল- মাঠা তৈরি হয় মূলত গরুর দুধ থেকে, তাই দুগ্ধ সমৃদ্ধ এ উপজেলার দুধের আলাদা সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। যার ফলে এখানে ভালো এবং অত্যন্ত সুস্বাদু ঘোল- মাঠা তৈরি হয় এ ক্ষেত্রে মাঠা তৈরির কারিগরদেরও রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।এই সুস্বাদু পানীয় তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় খাঁটি দুধ। প্রতিদিন ভোরে সংগ্রহ করা দুধ প্রথমে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ধরে ফুটানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে জাল দেওয়ার পর সারারাত রেখে দেওয়া হয়। সকালে জমে থাকা সেই দুধের সঙ্গে চিনি ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় বেড়ার ঐতিহ্যবাহী ঘোল- মাঠা।উপজেলার হাটুরিয়া, নাকালিয়া, জগন্নাথপুর, পেচাকোলা, মোহনগঞ্জ, মালদাহপাড়া, ডাকবাংলা এবং উপজেলার প্রাণকেন্দ্র সিঅ্যান্ডবি বাসস্ট্যান্ড সহ বেড়া পৌর এলাকায় রয়েছে অসংখ্য মাঠা তৈরির কারিগর। বুধবার কথা হয় ঐতিহ্যবাহী নাকালিয়া বাজারের মাঠা তৈরি কারিগর বাসুদেব ঘোষের সাথে। তিনি বলেন , সারা বছরের তুলনায় রমজান মাসে তাদের ঘোল মাঠার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তবে এ বছর আবহাওয়া একটু ঠান্ডা থাকায় গতবারের চেয়ে বিক্রি একটু কম হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তাঁর থেকে পাইকারি দরে ঘোল – মাঠা কিনে নিয়ে যায়। আরেক মাঠা ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন , রমজান মাসে মাঠার চাহিদা বাড়লেও দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এ বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। বর্তমান ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে প্রতি কেজি মাঠা খুচরা বিক্রি করছেন ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা। রমজানের পবিত্রতা রক্ষার জন্য উৎপাদিত ঘোল- মাঠা স্বল্প লাভে পাইকারি এবং খুচরা বিক্রি করছেন বলে জানান তারা। পেচাকোলা বাজারের ঘোল-মাঠা কারিগর নিখিল ঘোষ,উত্তম ঘোষ এ প্রতিবেদককে জানান, চলতি রমজানে প্রতিদিন পেচাকোলা বাজার, মোহনগঞ্জ বাজার, হাটুরিয়া চারমাথা এলাকাসহ চরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় শতাধিক মণ ঘোল- মাঠা বিক্রি হয়।তবে দুধের দাম বেশি হওযায় মাঠার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমান অনেকটাই কম হচ্ছে তবু রমজান মাস উপলক্ষে কম লাভেই মাঠা বিক্রি করছি।বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা সুলতানা নীলা ঢাকা প্রতিদিনকে জানান,ঘোল-মাঠা অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন একটি পানীয় খাবার ।
এতে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন, উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা শরীরের জন্য ভালো। এবং হজম শক্তি বৃদ্ধি করতে অত্যন্ত কার্যকর। ক্লান্তি, দূর করে প্রশান্তি আনে, মেজাজ ফুরফুরে রাখে। এ কারণে যুগ যুগ ধরে মানুষ এই তরল পানীয় খাদ্য পান করে আসছেন।