দুপুরের রোদ একটু নরম হতেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে জৈনাবাজার এলাকায় তরী রেস্টুরেন্ট প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন মানুষ।
কারও হাতে পুরোনো ব্যাগ, কারও চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই যখন তাদের সামনে তুলে দেওয়া হয় ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, সবজি আর মাংস—তখন সেই চোখেই ভেসে ওঠে তৃপ্তির ঝিলিক। যেন একবেলার এই খাবারই তাদের দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
গাজীপুরের শ্রীপুরে জৈনা বাজার এলাকায় গত চার বছর ধরে এমন দৃশ্য নিয়মিত। প্রতি বুধবার, বিশেষ করে হাটের দিনে, অসহায়, পথচারী ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য আয়োজন করা হয় খাবারের। শুরুটা ছিল খুবই নীরব—রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল।
কোনো প্রচার নয়, ছিল শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিঃস্বার্থ চেষ্টা।
সময় গড়িয়েছে, আর সেই ছোট্ট উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক হৃদয়। এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক—সমাজের নানা শ্রেণির মানুষ এগিয়ে আসছেন। কেউ একদিনের খাবারের দায়িত্ব নিচ্ছেন, কেউ বা নিয়মিত সহযোগিতা করছেন। এক প্লেট খাবার যেন এখানে ভালোবাসা আর সহমর্মিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
চলতি সপ্তাহে এই আয়োজনের দায়িত্ব নেন গাজীপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক এনামুল হক মনি। বুধবার (১৫ এপ্রিল) তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রায় শতাধিক মানুষ। কেউ ধীরে ধীরে খাচ্ছেন, কেউ আবার দীর্ঘ ক্ষুধার পর তাড়াহুড়ো করে। কিন্তু সবার মুখেই একই তৃপ্তি—এক ধরনের নিশ্চিন্ততার হাসি।
খাবার শেষে অনেকেই হাত তুলে দোয়া করেন। কেউ বলেন, “আল্লাহ ওনাকে ভালো রাখুক” কেউ আবার নীরবে চোখ মুছেন। এই দোয়ার শব্দে যেন মিলেমিশে থাকে কৃতজ্ঞতা, বেদনা আর আশার গল্প।
স্থানীয় তরীর পাশেই দোকানদার জামাল উদ্দিন বলেন, এই আয়োজন শুধু ক্ষুধা নিবারণের জন্য নয়; এটি মানুষে মানুষে সম্পর্কের এক গভীর বন্ধন তৈরি করছে। এখানে কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়—সবাই শুধু মানুষ।
এনামুল হক মনি বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির আসল অর্থ। আমরা যদি একটু করে এগিয়ে আসি, তাহলে অনেক মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব।
শ্রীপুরের জৈনা বাজার এই ছোট্ট প্রাঙ্গণে তাই প্রতি বুধবার শুধু খাবারই পরিবেশন হয় না—পরিবেশন হয় মানবতা, সহমর্মিতা আর ভালোবাসার এক নীরব গল্প।