রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় টিকটক কনটেন্ট নির্মাতা ও কলেজছাত্র রাকিব হত্যাকাণ্ডে এক তরুণীর সঙ্গে তার যোগাযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সন্দেহ থেকেই এ হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই তরুণীর স্বামী সাজিদের নির্দেশে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
ডিএমপি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে কলেজছাত্র রাকিব হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলেন শিহাব, জয়, রাফিন, সাগর ও সালাউদ্দিন।
এদের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে রাফিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে শিহাব ও জয়কে খুলনা থেকে, সাগরকে পটুয়াখালী থেকে এবং সালাউদ্দিনকে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম এসব তথ্য জানান।
ডিসি মাসুদ আলম বলেন, খুলনা অঞ্চলের মাদক কারবারি সাজিদের সঙ্গে একসময় রাকিবের ভালো সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু সাজিদের স্ত্রীর সঙ্গে রাকিবের যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে, সেই সন্দেহ থেকেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
তিনি বলেন, সাজিদের স্ত্রী জান্নাত মুনের সঙ্গে রাকিবের সম্পর্ক কতদূর গিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সাজিদ বিষয়টি সন্দেহের চোখে দেখতেন এবং এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে রাকিবকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ভাড়াটে খুনিদের টাকা দিয়ে তাকে হত্যা করানো হয়।
ডিসি আরও বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে চারজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। গুলি চালানো ব্যক্তির নাম আলামিন, তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। শিহাব, জয় ও রাফিন ধারালো অস্ত্র দিয়ে রাকিবকে কুপিয়ে জখম করে। সাগর ঘটনাস্থলে থাকলেও সরাসরি আঘাত করেনি। আর সালাউদ্দিন অস্ত্র সরবরাহ ও পুরো ঘটনার সমন্বয় করেছিল।
তিনি জানান, এ ঘটনায় জড়িত আরও সাত থেকে আটজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্তে জানা যায়, হত্যাকারীরা খুলনা থেকে পরিকল্পিতভাবে ঢাকায় আসে। তারা রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান নেয়; বিশেষ করে ফকিরাপুলের একটি হোটেলে কয়েকজন এবং সোনারগাঁও হোটেলে দুজন ছিল। এসব তথ্যের সমর্থনে সিসিটিভি ফুটেজও পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, হত্যার আগে তারা রাকিবকে অনুসরণ (রেকি) করে। রাকিব প্রতিদিন রাতে শহীদ মিনার এলাকায় যেতেন এবং টিকটক কনটেন্ট তৈরির কারণে তার বড় একটি পরিচিত মহল ছিল।
ঘটনার দিন পরিকল্পনা অনুযায়ী চারজন সরাসরি হামলায় অংশ নেয় এবং অন্যরা ব্যাকআপে ছিল।
পুলিশ আরও জানায়, রাকিব দুই-তিন বছর আগে প্রথম বিয়ে করেন। পরে চার-পাঁচ মাস আগে ‘সাফা’ নামে আরেক তরুণীকে ‘বাজি ধরে’ বিয়ে করেন বলে তার বন্ধুদের কাছ থেকে জানা গেছে। এছাড়া জান্নাত মুন নামে এক কনটেন্ট নির্মাতার সঙ্গেও তিনি নিয়মিত টিকটক করতেন।
এই জান্নাত মুনের স্বামী সাজিদই খুলনা থেকে ভাড়াটে খুনি পাঠিয়ে রাকিবকে হত্যা করিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।
ডিসি মাসুদ আলম বলেন, তদন্ত এখনো চলমান। কোথাও কোনো ফাঁক থাকলে আমরা তা খতিয়ে দেখে পূর্ণ চিত্র তুলে ধরব।
তিনি আরও বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অপরাধী চক্র বড় ধরনের সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকে। এরা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ এবং অর্থের বিনিময়ে যেকোনো অপরাধ করতে পারে।
এর আগে, গত রোববার রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বোরহান উদ্দিন কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন রাকিব। এ সময় তিন থেকে চারজন হামলাকারী এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে তাকে গুরুতর আহত করে। পরে মাথায় গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
রাকিবের গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার চৌমুহনী গ্রামে। তিনি ঢাকার নিমতলী, নাজিমউদ্দিন রোডে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। ঘটনার পরদিনই তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, ‘নারী-সংক্রান্ত বিরোধ’কে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
রাকিবের স্ত্রী হাবিবা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সাংবাদিকদের জানান, বগুড়ায় এক কনটেন্ট নির্মাতার বিয়েতে গিয়ে জান্নাত মুনের সঙ্গে রাকিবের পরিচয় হয়। এরপর থেকে জান্নাত তাদের বাসায় যাতায়াত করতেন।
তখন তিনি হত্যার পেছনে জান্নাতের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে সন্দেহ করলেও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানালো, জান্নাতের স্বামী সাজিদই এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী।