স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন নিয়মিত অফিস না করায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন এর অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে কর্মকর্তাদের একটি অংশ, ঠিকাদার, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাক্ষাৎ প্রার্থীরা বলছেন, প্রধান প্রকৌশলী অধিকাংশ সময় মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করেন। ফলে এলজিইডি সদর দপ্তরে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায় না। এতে জরুরি ফাইল নিষ্পত্তি বিলম্বিত হচ্ছে, আটকে থাকছে নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এদিকে গত ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি অফিসে অনিয়ম, দুর্নীতি, বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতি বা দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ও সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ (সংশোধিত) অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, বা ফৌজদারি মামলাসহ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বেলাল হোসেনের অফিসে উপস্থিতি কম। প্রায় প্রতিদিনই তিনি মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগে গিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এতে সদর দপ্তরের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অনেকে সাক্ষাৎ না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বদলি, পদোন্নতি, প্রকল্প অনুমোদন ও টেন্ডারসংক্রান্ত নথিপত্র দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, সকালে অফিসে এসে জানতে পারি স্যার মন্ত্রণালয়ে গেছেন। পরে আবার বলা হয়, বিকেলে আসবেন। কিন্তু অনেক সময় তিনি আর আসেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল জমতে থাকে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর কক্ষে ফাইলের স্তুপ পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সব অনিয়মের ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ ও শাস্তি:
সংজ্ঞা: বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ, অফিসে দেরি করে আসা, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া বা অনুপুস্থিত থাকা অসদাচরণ বা অনিয়ম হিসেবে গণ্য। তদন্ত প্রক্রিয়া: অভিযোগের পর কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হবে, যার জবাব দেওয়ার জন্য ৭ কার্যদিবস সময় পাওয়া যাবে।
কিন্তু এলজিইডি সদর দপ্তরে গত কয়েক সপ্তাহে যাওয়া কয়েকজন সাক্ষাৎপ্রার্থী জানান, তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। একজন ঠিকাদার বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে থেকেও দেখা হয়নি। পরে কর্মকর্তারা জানান, তিনি মন্ত্রণালয়ে আছেন।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এলজিইডির মতো বড় প্রতিষ্ঠানে প্রধান প্রকৌশলীর নিয়মিত উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাস্তি: এই সব কারণে বিভাগীয় মামলা, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে এই সংস্থার ভূমিকা বড়। ফলে প্রধান নির্বাহী পর্যায়ে অনুপস্থিতি প্রশাসনিক গতি কমিয়ে দিতে পারে।
যেভাবে দায়িত্বে এলেন বেলাল হোসেন: তিনি এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১৪ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর “রুটিন দায়িত্ব” দেওয়া হয় বর্তমানে তিনি প্রধান প্রকৌশলী (চ:দা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি এলজিইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনো মানবসম্পদ উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ ইউনিটে, আবার কখনো মনিটরিং, অডিট, প্রকিউরমেন্ট ও আইসিটি ইউনিটে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজ’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি সূত্র জানায়, আগের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বেলাল হোসেনকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফাইলজটে কির্যক্রমে ধীরগতি: এলজিইডির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদন ছাড়া অনেক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না। জেলা পর্যায়ের প্রকল্প, অর্থ ছাড়, টেন্ডার মূল্যায়ন ও বিভিন্ন ক্রয় প্রস্তাব তাঁর অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু তিনি নিয়মিত অফিসে না থাকায় এসব ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় ফাইল নিয়ে মন্ত্রণালয়ে যেতে হয়। এতে সময় ও জনবল-দুইয়ের অপচয় হচ্ছে। এদিকে কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, প্রধান প্রকৌশলীর অনুপস্থিতির সুযোগে দপ্তরের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন। এতে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সাক্ষাৎপ্রার্থীদের দুর্ভোগ: প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এলজিইডি সদর দপ্তরে আসেন ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও সাধারণ সেবা প্রার্থী। তাঁদের অনেকেই প্রধান প্রকৌশলীর সাক্ষাৎ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাজশাহী থেকে আসা এক ঠিকাদার বলেন, “দুই দিন ধরে অফিসে ঘুরছি। বলা হচ্ছে স্যার ব্যস্ত, পরে আসতে। কিন্তু দেখা করার সুযোগই মিলছে না।”
এক জনপ্রতিনিধি বলেন, “স্থানীয় একটি সড়ক প্রকল্পের বিষয়ে জরুরি আলোচনা করতে এসেছিলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানালেন, প্রধান প্রকৌশলী মন্ত্রণালয়ে আছেন।”এই সব অনিয়মের বিষয়ে জানতে বেলাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এদিকে প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য নয়, সেবাপ্রার্থীদের আস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও জরুরি। এলজিইডির মতো বড় প্রকৌশল সংস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি হলে এর প্রভাব মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে।