দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুটি তেলবাহী মাদার ট্যাঙ্কার কিনতে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়লা, সিমেন্ট কিঙ্কার, গমের মতো পণ্য দেশে আনতে দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ারও কেনা হবে। এসব জাহাজ কিনতে ঋণ দেবে চীনা সরকার।
মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪টি জাহাজ কেনার জন্য ২ হাজার ৬২০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জন্য কিনতে যাওয়া এসব জাহাজের জন্য ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চীন। বাকি ১৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বিএসসির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। সব জাহাজই চীন থেকে কেনা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে জাহাজগুলো বিএসসির বহরে যুক্ত হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিএসসির নিজস্ব ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ক্রুড অয়েল বাংলাদেশের সুবিধাজনক সময়সূচি অনুযায়ী আমদানি করা সম্ভব হবে। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া, মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের মাধ্যমে কয়লা, সিমেন্ট কিঙ্কার, গম ইত্যাদি বিভাজ্যপণ্য আমদানি সহজতর হবে। তদুপরি সমুদ্রে পরিচালনার জন্য ৪টি জাহাজে বার্ষিক প্রায় ২৫০ জন মেরিন অফিসার এবং ক্রুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এ ছাড়াও, জাহাজগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব সময়সূচি অনুযায়ী মাদার ট্যাঙ্কারে জ্বালানি পরিবহন করা হবে।
আমদানি করা ক্রুড অয়েল সরাসরি আনলোড করার জন্য বঙ্গোপসাগরে মহেশখালীর পশ্চিম প্রান্তে ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরি’ নামের একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে যে দুটি মাদার ট্যাঙ্কার কেনা হচ্ছে, সেসব জাহাজ বঙ্গোপসাগরে ভিড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও রিফাইন্ড প্রোডাক্ট সরাসরি ইস্টার্ন রিফাইনারির ডিপোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।
প্রতিটি মাদার ট্যাঙ্কারের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটি সম্পন্ন। আর প্রতিটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি পণ্য পরিবহন করতে পারবে। জাহাজ ৪টি পরিচালনার জন্য বছরে প্রায় ২৫০ জন মেরিন অফিসার এবং ক্রুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএসসির পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কেনার পরিকল্পনায় থাকা ২০টি জাহাজের মধ্যে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার (ডিডব্লিউটি) ৪টি বাল্ক ক্যারিয়ার, ১ লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার দুটি ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কার, ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি সম্পন্ন দুটি মাদার প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাঙ্কার, ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টিউজ ধারণক্ষমতার ৬টি কন্টেইনার জাহাজ। এ ছাড়া ১ লাখ ৪০ হাজার সিবিএম ক্ষমতার দুটি, ১ লাখ ৭৪ হাজার সিবিএম ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি এবং ১ লাখ ৮০ হাজার সিবিএম ধারণক্ষক্ষমতার দুটিসহ মোট ৬টি এলএনজি জাহাজ। এর মধ্যে ৬টি কন্টেইনার জাহাজ কেনার জন্য দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর জাহাজগুলোর টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বিএসসি।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, বিএসসির বিদ্যমান বহরের জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন। ইস্টার রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএফ) ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব সময়সূচি অনুযায়ী বিএসসির জাহাজের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল এবং খাদ্য বিভাগ ও অন্যান্য সংস্থার জন্য গম, চাল, সিমেন্ট, ক্লিংকার, সার ইত্যাদি বিভাজ্য পণ্য পরিবহন করে ভাড়া বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক রুটে বিএসসির জাহাজ ভাড়া প্রদান করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। ব্লু ইকোনমির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শিপিং সেক্টরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। মেরিটাইম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি।
প্রকল্পের পটভূমি ও গ্রহণের যৌক্তিকতার বিষয়ে বলা হয়েছে, সরকারের ভিশন ২০৪১-কে সামনে রেখে দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের নিমিত্ত তেল আমদানির পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে আমদানিতব্য ক্রুড অয়েল ও রিফাইন্ড প্রোডাক্ট সুষ্ঠুভাবে ও কম সময়ে খালাসের নিমিত্ত বিপিসি কর্তৃক ÔInstallation of Single Point Mooring (SPM) with Double PipelineÕ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বঙ্গোপসাগর খেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে মাদার ট্যাঙ্কার থেকে ক্রুড অয়েল ও রিফাইড প্রোডাক্ট ইস্টার্ন রিফাইনারির ডিপোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে ওই প্রকল্পের ৯৬ শতাংশের বেশি অগ্রগতি হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যে কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ দুটি মাদার ট্যাঙ্কার সংগ্রহের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল পরিবহনে বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।