সেবার নাম ভিন্ন দেখিয়ে ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চিঠির অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে দুই রকম হারে কর দিয়ে আসছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থা। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এ করহার স্পষ্ট করতে এনবিআরকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল মার্কেটিং ও অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিংয়ের সংজ্ঞা স্পষ্ট করেছে এনবিআর। গতকাল এ বিষয়ে এনবিআরের দেয়া সংজ্ঞা সংযুক্ত করে একটি চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অবহিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এনবিআরের দেয়া সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার হলে অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ওয়েবসাইটে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার বা কোনো কনটেন্টের প্রমোশন বা বিপণন করা হলে তা ডিজিটাল মার্কেটিং হিসেবে গণ্য হবে। কোনো টেলিভশন বা রেডিও চ্যানেলে প্রচারিত কোনো কনটেন্ট বা বিজ্ঞাপন ডিজিটাল মার্কেটিং হিসেবে গণ্য হবে না। এছাড়া কোনো টেলিভিশন বা রেডিও চ্যানেলে কোনো বিজ্ঞাপন সম্প্রচার হলেই কেবল তা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিং হিসেবে গণ্য হবে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার হলে অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা ওয়েবসাইটে কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার বা কোনো কনটেন্টের প্রমোশন বা বিপণন করা হলে তা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিং হিসেবে গণ্য হবে না।’ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে কর হার ১৫ শতাংশ ও অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে কর হার ২০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে সময় টেলিভিশনের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান সালাউদ্দিন সেলিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের অসততা করে না। কিছু ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েছে। অনেকেই কর কম দেয়ার জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে। এ চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি এখন স্পষ্ট হয়েছে। এখন আর কর কম দেয়ার সুযোগ পাবে না কেউ। এক্ষেত্রে সরকার লাভবান হবে। কারণ কর আদায়ে এ খাতে শৃঙ্খলা আসবে।’
এর আগে এ দুটি বিষয়ের স্পষ্ট সংজ্ঞা চেয়ে এনবিআরকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে এনবিআরের দুটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এনবিআরের চিঠি অনুযায়ী অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ হারে কর নির্ধারিত হলেও রেমিট্যান্স দেয়ার সময় কিছু প্রতিষ্ঠান ১৫ শতাংশ হারে কর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা সেবার নাম ভিন্নভাবে উল্লেখ করছে। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। চিঠিতে আরো বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক কিছু গ্রাহক থেকে গুগল এশিয়া প্যাসিফিক পিটিই লি. ও মেটার অনুকূলে রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় ১৫ শতাংশ হারে কর দিচ্ছে। এছাড়া একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে তাদের দুটি ভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে একই ধরনের সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন রেটে কর কাটা হচ্ছে।
আগের চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয় গুগল, মেটা বা এ জাতীয় অন্যান্য প্লাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচারের অনুকূলে রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় এশিয়া মার্কেটিং লিমিটেড, এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ার লিমিটেড, হ্যাভাস মিডিয়া লিমিটেড ও অ্যাক্সিয়েটা ডিজিটাল বাংলাদেশ লিমিটেডসহ অনেক বিজ্ঞাপনদাতা সংস্থা ১৫ শতাংশ হারে কর দিচ্ছে। অন্যদিকে একই ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারকারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন মিডিয়াকম লিমিটেড, এইচটিটিপুল বাংলাদেশ লিমিটেড ও গ্রামীণফোন ইত্যাদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দুটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০ শতাংশ হারে কর দিচ্ছে। ভিন্ন হারে কর দেয়ার ক্ষেত্রে কেউ এ সেবাকে ডিজিটাল মার্কেটিং হিসেবে উল্লেখ করছে, আবার কেউ কেউ এটাকে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিং হিসেবে উল্লেখ করছে। ফলে এ খাতে রেমিট্যান্স আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে কর কর্তনের ভিন্নতার জন্য অনুমোদনও ব্যাহত হচ্ছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নতুন সংজ্ঞা মেনে কর গ্রহণ ও প্রদানের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ১৭ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে পত্রের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং ও অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ব্রডকাস্টিং সেবাদ্বয় সম্পর্কে স্পষ্টকরণ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে ৩০ জুন ২০২৩ পর্যন্ত বর্ণিত সেবার বিপরীতে প্রযোজ্য কর হার অনুসরণ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর আগে এ-সংক্রান্ত ভিন্ন ব্যাখ্যা সংবলিত কোনো পত্র জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হতে জারি করা হয়ে থাকলে তা এ চিঠি জারির পর হতে অকার্যকর বলে গণ্য হবে।’