অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে উন্নয়নমূলক কাজ নির্বিঘ্ন রাখতে বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প অনুমোদনে জোর দিচ্ছে সরকার। মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন প্রাপ্ত ১২ প্রকল্পের মোট ১৯ হাজার ৫৯৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ১৩ হাজার ২০৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাকি অর্থায়নের মধ্যে সরকার দেবে ৬ হাজার ২৬০ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
সড়ক নিরাপত্তায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প : সড়ক দুর্ঘটনা কমানো এবং সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি বড় প্রকল্প নিয়েছে সরকার। ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। যার বেশিরভাগ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরসহ সরকারের ৪টি সংস্থা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ শীর্ষক প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশে পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর। প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। বাকি ৩ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা দেবে বিশ্বব্যাংক। অনুমোদন পেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছর মে থেকে শুরু করে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য দেশের সব উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির মাত্রা কমানো এবং সড়ক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। প্রকল্পের আওতায় ১১৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ১৪০ কিলোমিটার এন-৪ এবং এন-৬ সড়ক করিডোরে পাইলট ভিত্তিতে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রম, অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রম, টাঙ্গাইল ও বগুড়া জেলায় সড়ক নিরাপত্তা কার্যকর, পেশাদার গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ, বাস্তবায়নকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
এ ছাড়া বাইক অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজমেন্ট, কল সেন্টার ও অন্যান্য সার্ভিস, কন্ট্রোল রুম সংস্কার, ওষুধ এবং সরঞ্জামসহ অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ, হাইওয়ে পুলিশ ৫টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ, টাঙ্গাইল সদর হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি কক্ষ সংস্কার কাজ করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পটি বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্তির সুবিধার্থে অননুমোদিত নতুন পূরকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের হার প্রতি লাখে ১৩-তে নামিয়ে আনা এবং এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সবার জন্য প্রবেশগম্য এবং টেকসই পরিবহনব্যবস্থা বিনির্মাণের কথা বলা আছে। ফলে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৫১৪০ কিমি সড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়টি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং এসডিজির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা কম হবে এবং দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির মাত্রা কমবে। এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কর্তৃক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একনেকে অনুমোদন।
এ ছাড়া অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রিনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিল্যান্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯১০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুড ইন দি ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ (বিসিআরএল)’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ৭৬ কোটি ৬ লাখ টাকা।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘বরিশাল জেলার সদর উপজেলায় চরকাউয়া, চাঁদমারী, জাগুয়া, লামচরি এবং চরমোনাই এলাকা কীর্তনখোলা নদীর ভাঙন হতে রক্ষা প্রকল্প’। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘ইমপ্রুভিং কম্পিউটার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং টারশিয়ারি এডুকেশন প্রজেক্ট। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
‘সেফার সাইবারস্পেস ফর ডিজিটাল বাংলাদেশ : ইনহ্যান্সিং ন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ পুলিশ। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯ কোটি ৮ লাখ টাকা।
‘ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৪১২ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেটগুলোর পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ‘জিটুজি ভিত্তিতে ২টি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাঙ্কার এবং ২টি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহ’ প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬২০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।