পিডিবির বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েই চলেছে। এর ফলে বাড়ছে ভর্তুকিও। দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও ভর্তুকি সামাল দিতে সরকারের লোকসানের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় ভর্তুকির অর্থ ছাড় না করায় তারল্য সংকটে বিদেশি ঋণের কিস্তি, বেসরকারি খাতের আইপিপি (ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) ও রেন্টাল এবং সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েক মাসের বকেয়া বিল পরিশোধে বিপাকে পড়েছে সংস্থাটি। সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় জরিমানার পরিমাণও বাড়ছে। এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে ডলার সংকট। এ অবস্থায় তারল্য সংকট কাটাতে দেশি-বিদেশি ঋণ নিতে চায় তারা।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৩৯৩ কোটি ৩০ লাখ ইউনিট। চলতি (২০২২-২৩) ও আগামী (২০২৩-২৪) দুই অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থা লোকসান গুনবে প্রায় ৯২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৪ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট। এ জন্য মোট উৎপাদন ব্যয় পড়বে ৯৪ হাজার ২৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ বিদ্যুৎ বিক্রি করে পিডিবির সম্ভাব্য আয় হবে ৫১ হাজার ৮৯১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর থেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল ও উৎসে কর বাদ দিয়ে চলতি অর্থবছর পিডিবির সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়াবে ৪৬ হাজার ২৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে আগামী অর্থবছর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের (সম্ভাব্য) পরিমাণ দাঁড়াবে ৯ হাজার ৭১৪ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এ জন্য মোট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াবে এক লাখ চার হাজার ৬০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ বিদ্যুৎ বিক্রি করে পিডিবির সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার ১৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর থেকে অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়ে আগামী অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়াবে ৪৬ হাজার ৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সম্প্রতি সরবরাহ করা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ইউনিট প্রতি ১ টাকারও বেশি বেড়ে গেছে।
পিডিবির তথ্য মতে, মাত্র দেড় বছরে বিদ্যুতের বাল্ক সরবরাহ ব্যয় বেড়ে গেছে প্রায় ৮১ দশমিক ১৭ শতাংশ। তা সামাল দিতে তিন মাসে বাল্ক বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য দুই দফায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এরপরও ঘাটতি না কমে প্রায় চারগুণ হয়ে গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বাল্ক বিদ্যুতের সরবরাহ মূল্য দাঁড়ায় ৯ টাকা ৪৪ পয়সা। যদিও ওই সময় বাল্ক মূল্যহার ছিল ৫ টাকা ৯ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে পিডিবির লোকসান ছিল ৪ টাকা ৩৫ পয়সা। প্রতি ইউনিট বাল্ক বিদ্যুতের সরবরাহ মূল্য চলতি অর্থবছরে দাঁড়াবে ১১ টাকা ৫৪ পয়সা। দুই দফা বৃদ্ধির পর বর্তমানে বিদ্যুতের বাল্ক মূল্যহার দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে পিডিবির ঘাটতি দাঁড়াবে ৪ টাকা ৮৪ পয়সা। আর আগামী অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বাল্ক বিদ্যুতের সরবরাহ মূল্য আগামী অর্থবছরে দাঁড়াবে ১১ টাকা ৮৫ পয়সা। বর্তমান বাল্ক মূল্যহার (৬ টাকা ৭০ পয়সা) বিবেচনায় প্রতি ইউনিটে পিডিবির ঘাটতি দাঁড়াবে ৫ টাকা ১৫ পয়সা।
২০২২ সালের শুরু থেকে বিদ্যুৎ খাতে নিয়মিত ভর্তুকি ছাড় করছে না অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে তারল্য সংকটে ভুগছে পিডিবি। গত বছর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি বকেয়া পড়েছে ২৭ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। ফলে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে প্রায় ২৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০২২ সালের ভর্তুকি বকেয়া পড়েছে ২৯ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এমনকি ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধও বিলম্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ (মার্চের বিল) পিডিবিকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ডলারের বিল দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২১৪ কোটি টাকা। আদানিকে এ বিল ডলারেই পরিশোধ করতে হবে বিপিডিবির।
এ ছাড়া আইপিপি (ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল ৫ মাসের বেশি বকেয়া হওয়ায় বিলের পাশাপাশি ছয় হাজার কোটি টাকা জরিমানাও গুনতে হবে পিডিবিকে। পাশাপাশি আইপিপিগুলোর বিপুল পরিমাণ অর্থ অপরিশোধিত থাকায় কোম্পানিগুলো যথাসময়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না।
সব মিলিয়ে তারল্য সংকট কাটাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিষয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সবরকম চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই খাতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেশি। আমরা ১৫ হাজার মেগাওয়াট ব্যবহার করলেও সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। ক্যাপাসিটি চার্জ, তেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে এখন এলএনজির দাম অনেক কমেছে। কিন্তু বেশি এনে মজুদ করার সক্ষমতা আমাদের নেই। তাই এখনও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। হয়তো আগামী মাসে আবারও ৫ শতাংশ খুচরায় বাড়াবে। এখনও পাইকারিতে সরকারকে ৪০ শতাংশ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। টাকা অপচয় করলে বিদ্যুতের দাম বাড়বেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি দ্রুত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।