বিগত এক বছরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ড ও বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে । রাজধানীতে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের মূল কারণ হচ্ছে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ ও সিলিন্ডার গ্যাস। অনাকাঙ্ক্ষিত এসব বিস্ফোরণে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ কি ভুমিকা রাখছে এবং শুধু মিরপুর অঞ্চল থেকেই প্রতিমাসে কতো টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তারই তথ্য উপাত্ত। গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অবৈধ সংযোগ ও তিতাস গ্যাস হরিলুটের নেপথ্য কাহিনী।
মিরপুর অঞ্চলের তিতাস অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা,কালো তালিকা ভুক্ত তিতাসের ঠিকাদার এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল মিলেমিশে গ্যাস হরিলুটের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।
জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের অধীন গ্যাস শিল্প বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম। গ্যাস শিল্পের উপর নির্ভর করেই দেশে চালু হয়ছে বিভিন্ন কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান। এই সেক্টরের উপর নির্ভরশীল অসংখ্য পরিবার। বিভাগীয় শহর, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা শহরে গ্যাসের অবাধ ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা শহরে যারা বসবাস করেন তারা গ্যাস ছাড়া একটি দিন কল্পনা ও করতে পারেননা। পানির অপর নাম যেমন জীবন তেমনি গ্যাস ও কোনো অংশে কম ভুমিকা রাখছেনা। যেখানে তিতাস গ্যাসের বড় বড় কর্মকর্তাদের বসবাস, সেই ঢাকা শহরেই গড়ে উঠেছে অবৈধ গ্যাস সিন্ডিকেটের বিশাল চক্র।
অবৈধ সংযোগের বিষয় জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের ঠিকাদার জমির আলী বলেন,২০১৪ সালের পর থেকে বৈধভাবে নতুন সংযোগ না থাকায় এখন আর আগের মত ইনকাম নাই, যা টুকিটাকি কামাই রোজগার হয় তাও ভাগ বাটোয়ারা করে তেমন কিছু থাকে না। উপরের কর্মকর্তাদের দিতে হয় আবার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আছে। মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকার তিতাসের চাঁদা উত্তোলনকারি কারেন্ট কামাল ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন,কত দেখলাম আইলো আর গেল কই কেউই তো কিছু করতে পারল না। আমি বিএনপি করেও নয় বছর ধরে তিতাসের চাঁদা তুলতাছি আপনি রিপোর্ট করলে কিছুই হবে না সবখান সময়মত মাসোহারা পৌছে যায়। ভাষানটেক বস্তিতে অবৈধ তিতাস গ্যাস সংযোগের মুল হোতা গ্যাস দুলাল বলেন, ক্ষমতা আছে বলেই সংযোগ দিছি যায়গামত সঠিক সময়ে টাকা দেই। এর আগেও অনেক রিপোর্ট হইছে এখন রিপোর্ট করলে কিছুই হবে না। যারা ব্যবস্থা নিবে তারাই প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকা পায়।
গ্যাস বিপনণ নীতিমালা-২০১৪ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনে নতুন সংযোেগ দেয়া বন্ধের ঘােষনা থাকলেও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তিতাস গ্যাসের অসাধু কর্মকর্তা ও অর্থলোভী ঠিকাদারদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে দিনদিন বেড়েই চলছে অবৈধ্য গ্যাস সংযোগ। কিছু কিছু এলাকায় মাসোহারার বিনিময়ে জড়িয়ে আছে স্থানীয় প্রশাসন। ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী উপ- মহাব্যাবস্থাপক (প্রশাসন) কতৃক স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে (দপ্তরাদেশ নং ১২/২০২৮) বলা হয়, অবৈধ সংযোগ একবার বন্ধ করা হলে পরবর্তীতে বোর্ড সভার অনুমোদন ব্যতিরেকে পুনঃ সংযোগ দেয়া যাবেনা। একই সালের অফিস আদেশের (দপ্তরাদেশ নং -৩৪/২০১৮) বলা হয়,
(ক) কোম্পানীর ডিষ্টিবিউশন এলাকায় ১লা এপ্রিল-২০১৮ তারিখ হতে অবৈধ্য গ্যাস সংযোেগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযান পরিচালনা করতে হবে ?
(খ) যে সকল ডিষ্টিবিউশন এলাকায় ‘অবৈধ গ্যাস সংযোগ’ পাওয়া যাবে,সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার এবং তার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
(গ) এলএনজি’র গুরুত্ব তুলে ধরে লিফলেট আকারে ইলেট্রনিক্স মিডিয়াতে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রচার ও প্রচারনা চালাতে হবে।
(ঘ) ২০ এপ্রিল ২০১৮ এর মধ্যে সকল ডিষ্টিবিউশন এলাকায় অবৈধ্ গ্যাস সংযোগমুক্ত এলাকা ঘোষনা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের মেঘা ঘোষনা মুজিব বর্ষ -২০২০ উপলক্ষে তিতাস গ্যাসের লক্ষ্য-অবৈধ্য গ্যাস সংযোগমুক্ত গ্যাস বিতরন ব্যবস্থা। তবে সেটা শুধু লক্ষ্য-ই ছিলো,বাস্তবে লক্ষ্য পূরণ করা হয়নি।
যেখানে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ সেখানে কিভাবে অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী,সুপারভাইজারদের সাথে ঠিকাদার নামীয় কার্ডধারী দালালদের প্রত্যক্ষ সহযােগিতায় অবৈধ গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়? রাজধানীতে এমন ভবন খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে গ্যাসের সংযোগ নেই। অথচ এসব ভবনের এক তৃতীয়াংশেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে।
>>>যে কারণে বিস্ফোরণ আতঙ্কে মিরপুর<<<
বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় গত এক বছরে, ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তিতাসের অবৈধ সংযোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। যার ফলে গ্যাস চোর সিন্ডিকেট নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। শতভাগ অবৈধ গ্যাস সংযোগ থাকা ভবনে লোক দেখানো, গ্যাস সিলিন্ডার স্থাপন করেছেন চোরচক্র। ভবনের সামনে থেকে কোথাও গ্যাস সংযোগের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। অথচ, সংযোগ রয়েছে প্রতিটি ভবনেই। নিয়ম বহির্ভূত ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাইপ লাইন স্থাপন এবং প্লাস্টিক পাইপের ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন জায়গায় পাইপ লিকেজ এর ফলে অনবরত গ্যাস বের হয়। যার ফলে গ্যাস বিস্ফোরণ হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানার পাশে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স এলাকায় গতবছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। বাধার মুখে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করেই অভিযান স্থল ত্যাগ করেন তারা।
গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২০ সালেই এক প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস বা আর্থিক ক্ষতি দেখিয়েছে বিতরণ সংস্থা তিতাস। ওই বছর ৭৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা সিস্টেম লসের কারণে তিতাসের ক্ষতি হয়েছে।
অবৈধ সংযোগের কারণে যেসব এলাকায় বিস্ফোরণ আতঙ্ক!!
মিরপুর আনন্দনগর, বর্ধন বাড়ি, হরিরামপুর, জহুরাবাদ, গোলারটেক, ২য় কলোনী, গুদারাঘাট, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, হাজী রোডের পাশের বস্তি, রূপনগর আবাসিক,শিয়াল বাড়ি মাদবরের বস্তি, দুয়ারীপাড়া বস্তি,বড় পীরেরবাগ,ঝিলপার, ভাষানটেক বস্তি,লালাসরাই ফিমার বস্তি,ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পে আবুলের বস্তি, মিরপুর ১৩ লোহার ব্রীজের আসপাশের বস্তি এলাকা,শ্যামলপল্লী, ইমান নগর,পলাশ নগর। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় যতগুগো আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এর প্রায় সবগুলোতেই রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ।