অষ্টগ্রামে তৈরি বিখ্যাত পনির এখন দেশ-বিদেশে সমাদৃত। ভারতবর্ষে মোঘলদের শাসনামলে অষ্টগ্রামে পর্যাপ্ত দুধ পাওয়া যেত। তখন বড় হাওর নামক স্থানে উৎপাদিত এ পনির দিল্লির শাহী দরবার থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাজদরবার ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের কাছে সরবরাহ করা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়াও অষ্টগ্রামের বড় হাওরের এই উন্নত মানের পনির অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ড্রেনমার্ক ও লন্ডন থেকে গবেষকরা এসে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। বর্তমানে এই পনির জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে হাওর অঞ্চলে দুধের অভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় পনির উৎপাদন অনেকটা কমে গেছে। ফলে যেসব পরিবার পনির উৎপাদন ও বিপণন করত, তাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে। তবুও অনেকেই দুর্মূল্য এই পনির তৈরি করে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিক্রি করছে। ‘হাওর, জঙ্গল, মইষের শিং, তিনে মিলে ময়মনসিং’ বলে একটা প্রবাদই এই অঞ্চলে চালু ছিল। কারণ এক সময় হাওরে প্রচুর মহিষের খামার ছিল। আর এই মহিষের দুধের পনিরের মান সবচেয়ে ভালো। যে কারণে কোন এক গ্রামীণ কবি এই প্রবাদটি তৈরি করেছিলেন। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা, চান্দা, মান্দা, বেকা-টেকা, জঙ্গল কাটা, হুগ গাইল, ওজারপার, মহিষাটিলা, কাচ্ছিহাতা ইত্যাদি বিভিন্ন নামে হাওর এবং জঙ্গলে পরিপূর্ণ এই উপজেলা ও পাশ্ববর্তী এলাকাগুলো। এছাড়াও হাওরে ছিল অসংখ্য টিলা বা উঁচু স্থান। হাওরে এসব ভূমিতে উৎপাদিত হতো পর্যাপ্ত গো-খাদ্য। এছাড়া টিলা এবং উঁচু জমিতে বর্ষাকালে গবাদি পশু রাখা হতো। হাওরে চাইল্লা, হুগলা, দুর্বা, নলখাগড়া ইত্যাদি নানা প্রজাতির তৃণ জাতীয় গো-খাদ্য উৎপাদিত হতো। যান্ত্রিক চাষাবাদের আগে কৃষি ব্যবস্থাও গরু-মহিষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ অঞ্চলে পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে দুধের চাহিদা ছিল প্রচুর। ফলে কৃষকদের ঘরে ঘরে প্রচুর গাভী ও মহিষ পালন করা হতো। এগুলো থেকে পাওয়া যেত পর্যাপ্ত দুধ। এই দুধ শুধু পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হতো না। এগুলো দিয়ে তৈরি হতো ক্ষীর, মাঠা, সন্দেশ, ছানার বরফি এবং নানা জাতের সুস্বাদু মিষ্টি জাতীয় খাবার। এগুলো নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও মানুষ বেড়াতে যেত। হাওরগুলোতে গরু-মহিষ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হতো বাথান ঘর। এক সময়ে এই অঞ্চলের দুধের ক্রেতা ছিল না বললেই চলে। বড় হাওরে দুধ কাজে লাগাতে না পেরে অনেক কৃষক ঘাসের ওপর দুধ ফেলে দিতেন বলেও প্রবীণরা জানিয়েছেন। কথিত রয়েছে, এই অবস্থায় বাংলার বার ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ এই অঞ্চলে যুদ্ধ করার এক পর্যায়ে তার বংশধরেরা অষ্টগ্রামের কাস্তুল বাজারে একটি ছাউনী ঘর তোলেন। এই ছাউনী থেকে দেয়ান পনির খাঁ নামে এক মোঘল সন্তান হাওরে যান এবং পর্যাপ্ত দুধ দেখতে পেয়ে বেশ খুশি হন। এক পর্যায়ে কাঁচা দুধের ছানা করে বাঁশের ছোট ছোট খাঁচায় রেখে কিছু লবণ দিয়ে এক প্রকার সংরক্ষণযোগ্য শুকনো খাবার তৈরি করেন। আর এগুলো দিল্লী থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে আকর্ষণীয় খাদ্য হিসাবে সরবরাহ হতে থাকে। এক পর্যায়ে দেয়ান পনির খাঁর নামানুসারে এই বিশেষ ধরনের খাবারটির নাম দেয়া হয় ‘পনির-এ দেয়ান’। এই পনিরের কারিগর সুজন খাঁ, উত্তরহাটির মফিজ চৌধুরীসহ অনেকেই জানান, এক মণ দুধে ৬ কেজি ছানা হয় এবং লবণ দিয়ে ৭ কেজি পনির তৈরি করা যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি পনির ৬শ’ থেকে ৮শ’ টাকা বিক্রি হচ্ছে। অষ্টগ্রামের পনির রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হচ্ছে। এ ব্যাপারে অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম জেমস জানান, অষ্টগ্রামের পনির হলো ঐতিহ্যবাহী। দেশ-বিদেশে এই পনিরের সুনাম রয়েছে এবং অর্থনৈতিকভাবে ভালো ভূমিকা রাখছে। এর উন্নয়নে সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশাবাদী। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, পনিরকে জেলা ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে এর উন্নয়ন ও প্রসারে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।