ঢাকা প্রতিদিন সাহিত্য ডেস্ক : ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগডাশে। মতি মিয়ার বিরাট সংসার। চার সন্তানের জনক মতি মিয়ার সংসার গ্রাম বাংলার অন্যান্য অপরিকল্পিত সংসারের মতো অভাবেই চলে। সন্তানরা যত বড় হয়, মতি মিয়ার স্বপ্নও ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। তার আশা একদিন তার সন্তানরা আয় করা শুরু করলে এ অভাবের সংসারে খুশির বন্যা বয়ে যাবে।
তাই যে কোনোভাবেই হোক এদের বড় করতে পারলেই সংসারের সব অভাব দূর হবে একদিন। ছেলেরাই মতি মিয়ার আশা ভরসা। কিন্তু সন্তানরা যখন সত্যিই বড় হতে লাগল, মতি মিয়ার স্বপ্ন বড় থেকে যেন ফিকে হতে শুরু করল। কেননা বড় ছেলে একটু বুদ্ধি সুদ্ধি কম হওয়ায় তাকে মতি মিয়া নিজের সঙ্গেই কৃষি কাজে যুক্ত করেন। মেজো ছেলেটা শহরে গিয়ে আর ফেরেনি। কোথায় আছে, কী করছে খুব একটা খবর রাখেননি মতি মিয়া।
সেজো ছেলে পড়ালেখায় ভালো হলেও নানা কারণে তাকে আর পড়াননি মতি মিয়া। ছোট ছেলে মোটামুটি ছোটই-তাই তার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি মতি মিয়া। আশা ছিল অন্য ছেলের আয় দিয়ে ছোট ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলবেন। যাই হোক, সেজো ছেলে কীভাবে যেন কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করে আরও কিছু টাকার জন্য বাবার কাছে এলো। উদ্দেশ্য, বিদেশ যাবে।
কিন্তু মতি মিয়ার সাফ কথা, মুরোদ থাকলে নিজের টাকায় যাও। এক পয়সা ভাংতে পারব না তোমাদের পেছনে। কারণ অন্যদের দিয়ে মতি মিয়ার দারুণ শিক্ষা হয়েছে। অবশেষে সেজো ছেলেটা প্রথম দফায় টাকার অভাবে বিদেশ যেতে পারল না। কিন্তু সে দমে যায়নি। কাজ কর্মের ফাঁকে ফাঁকে বিদেশ যাত্রার স্বপ্ন ঠিকই দেখতে থাকে। আর চেষ্টা থাকলে যা হয়, এক সময় ভাগ্যও তাকে সহায়তা করল। এলাকার এক ব্যক্তিকে পেয়ে গেল, যে কিনা আপাতত কিছু টাকা নিয়ে তাকে পাঠাতে রাজি আছে, বাকি টাকা বিদেশে গিয়ে সুদ সমেত ফেরত দিলেই হবে।
সেজো ছেলেটি এমনিতেই কর্মঠ ছিল, ছিল আত্মবিশ্বাস। সে আর দুবার চিন্তা না করে রাজি হয়ে গেল। ওদিকে মতি মিয়া এ খবর পেয়ে দালালকে গ্রামের বাজারে সবার সামনে বলে দিল, যদি তার ছেলে বিদেশ গিয়ে তার দেনা-পাওনা শোধ করতে না পারে, সে জন্য যেন কখনো মতি মিয়াকে দায়ী করা না হয়। অর্থাৎ টাকা-পয়সার কোনো লেনদেনে মতি মিয়া নেই। কারণ চুন খেয়ে মুখ পোড়া মতি মিয়া এখন দই দেখলেও ভয় পান!
সেজো ছেলে বাবার এমন কথা শুনেও মুখে কিছু না বলে একদিন বিদেশ চলে গেল। যাওয়ার সময় কেউ বাসস্টেশনেও এলো না, কান্নাকাটি যা করার বাসায় টুকটাক করে ছেলেকে বিদায় দিলেন মতি মিয়ার পরিবার।
এদিকে মতি মিয়ার অন্য ছেলেরা যখন ধীরে ধীরে মতি মিয়ার আয়ের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল, তখন মতি মিয়ার সেজো ছেলে বিদেশে দারুণভাবে জমে গিয়েছিল। দালালের টাকা শোধ তো করেছেই, মতি মিয়ার সারা জীবনের স্বপ্ন পাকা বাড়িও করে দিয়েছে সেই অবহেলিত সেজো ছেলে। পরিবারের এমন উন্নতি দেখে মেজো ছেলেও আর দূরে থাকতে পারেনি। বউ সন্তান নিয়ে ফিরে এসেছে বাবার কাছে। সেজো ছেলের টাকায় এখন মতি মিয়া এলাকায় সচ্ছল হিসাবে বিবেচিত। এদিকে সেজো ছেলের বিয়ের বয়স হয়েছে, সে বিয়ের জন্য দেশে ফিরে আসবে অচিরেই। এ খবরে এলাকায়ও একটা খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়ল। কেননা এলাকার যে কোনো সামাজিক কাজে মতি মিয়ার সেজো ছেলে অবদান রাখে। টাকা-পয়সা দান করে। ফলে এবার এলাকাবাসী ঠিক করেছে গ্রামের ক্লাবে একটা এসি যদি আদায় করা যায় তো খুবই ভালো হয়। এতদিন ফোনে ফোনে যা আদায় করা গেছে, সামনাসামনি আরও বেশি পাওয়া যাবে। ক্লাব কমিটিও ব্যাপারটাকে স্মরণীয় করে রাখতে ছোটখাটো একটি প্রোগ্রাম আয়োজন করেছে। সেখানে স্থানীয় সাংবাদিকদেরও বলা হয়েছে ছবি তোলার জন্য।
একটি এসি, সঙ্গে কিছু ক্রীড়া সামগ্রীও প্রদান করবেন মতি মিয়ার সেজো ছেলে। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করল ক্লাব কমিটি। অনুষ্ঠানের দিন মতি মিয়ার সেজো ছেলের কাছ থেকে এসি নিয়ে এলাকার মেম্বার নিজে উঠলেন মঞ্চে। এরপর ক্রিড়া সামগ্রী। সেগুলো মতি মিয়ার বড় ছেলে আগে থেকেই তার হাতে নিয়ে রেখেছিলেন। কিছু বলার আগেই সে মঞ্চে দৌড়ে গেল। মতি মিয়া তখন সেজো ছেলের পাশেই। বড় ছেলে নামার আগেই মেজো ছেলে বাকি ক্রীড়া সামগ্রী নিয়ে বলল, ‘ভাই, এগুলা আমি নিয়া যাই?’
মতি মিয়ার সেজো ছেলে বললেন, ‘আমি তো নিজ হাতে কিছুই দিতে পারিনি! ঠিক আছে, আপনি যান।’ এই বলে মতি মিয়ার সেজো ছেলে বিরস বদনে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু ঘটনা দেখে যেতে লাগল। তার কেনা এসি আর ক্রীড়া সামগ্রী এরা বিলি করে কীভাবে হিরো সাজার চেষ্টা করছে। ঘটনাক্রমে সেই সাহায্যকারী লোকটাও পাশেই ছিল। এমন সময় ক্লাব কমিটির সভাপতি বললেন, ‘আসলে যিনি দাতা তিনিই তো এলেন না। আসেন ভাই, আপনের লগে একখান ছবি তুলি।’
স্থানীয় মেম্বার অমনি দৌড়ে মঞ্চে উঠে বললেন, ‘আমার স্মার্টফোন আছে, আমি সেলফি তুলতে জানি।’ মতি মিয়ার সেজো ছেলে উপস্থিত সবাইকে বললেন, ‘যে লোকটা আমারে বিদেশ পাঠিয়েছিল, সেও এখানে আছে, ওরে একটু ডাকি?’ মেজো ভাই বলল, ‘এমন কত দালাল আশপাশে ঘোরে, সবাইরে ডাকলে তো মঞ্চই ভরে যাবে, তুই আমার পেছনে দাঁড়া দেখি, আমি সবাইকে নিয়ে একটা সেলফি তুলি!’ পেছন থেকে সেই দালাল বলে উঠল, ‘সেলফিসের সেলফি!’
ঢাকা প্রতিদিন/এআর