আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর পাকিস্তানের তোড়জোড় বেড়েছে বাংলাদেশে। নতুন পরিস্থিতিতে দেশটির তৎপরতাও বেড়েছে। ঢাকা ও ইসলামাবাদ প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জোটবদ্ধ হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, একাত্তরে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং ৩ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুন্ঠিত হলেও বর্তমানে কি আমরা তাদের বন্ধু ভাববো?
আওয়ামী লীগের শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের হিমশীতল সম্পর্ক ছিল। সেটা এখন অতীত। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশটির তৎপরতা বেড়েছে বেশ। ঢাকা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীও পালিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মসূচি দেখা যায়নি। যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশ বড় রকমের বিতর্ক হয়েছে।
সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে যত্নশীল। শেখ হাসিনার পতনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছে ইসলামাবাদ। হাসিনার পতনে যে পাকিস্তান খুবই খুশি সেটা ঢাকায় তাদের কাজকর্মেই স্পষ্ট।
একাত্তরের পাকিস্তানিদের গণহত্যায় শামিল হওয়ার কারণে শেখ হাসিনা তার পুরো শাসনামলেই কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে পাকিস্তানের মিত্রশক্তিগুলোর ওপরও বেশ দমন পীড়ন চালিয়েছিলেন তিনি। দুই দেশের জনগণের মধ্যেও যোগাযোগ একেবারেই তলানিতে নেমে আসে। বন্ধ হয় ঢাকা ও করাচির মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল।
পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) তাদের বিমান কর্মীদের হয়রানির অভিযোগে ২০১৮ সালে ঢাকার পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। বিমান বাংলাদেশ অবশ্য আগেই তাদের পাকিস্তানের পরিষেবা বন্ধ করে। বহু বছর দুই দেশের মধ্যে কোনো শীর্ষ সরকারি পর্যায়ের সফর হয়নি। পররাষ্ট্র সচিবদের আলোচনাও ২০১৬ সাল থেকেই মুলতুবি রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠকও বন্ধ।
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আসতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতিতে এগিয়ে আসেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরই শুরু হয় সংযোগ। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরই তড়িঘড়ি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে নতুন সম্পর্ক আন্তর্জাতিক দুনিয়াকেও অবাক করে দিয়েছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। তাই পাকিস্তানের পাঞ্জাব বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ট্রেড ঢাকাস্থ সম্ভাব্য বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে পাঠায় পাকিস্তানি দূতাবাসের কাছে। সেইসঙ্গে দূতাবাসকে নির্দেশ দেওয়া হয় পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য প্রচার চালাতে। এছাড়াও ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ-সহ ১২৬টি দেশের জন্য বিনামূল্যে ভিসা সুবিধা চালু করেছে। তাছাড়া পাকিস্তানের সমর্থন ও অর্থায়ণে বাংলাদেশ ভিত্তিক ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান চেম্বার অফ কমার্স’ নামে একটি সংগঠন গঠন গড়ে তুলেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের সাথে টেলিফোনিক কথোপকথনের সময়ও বাংলাদেশের মন জয়ের চেষ্টা করেন। একাত্তরে গণহত্যার স্মৃতি ভুলে তিনি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বন্যার কারণে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্ধিত সহযোগিতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
ঢাকায় পাকিস্তানি হাইকমিশনার সৈয়দ আহমেদ মারুফের সাথে তার সৌজন্য সাক্ষাৎকালেই বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছিলেন ড. ইউনূস। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিন জোর দিয়েছেন। হাইকমিশনার সৈয়দ আহমদ মারুফ স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সাথে সাক্ষাত করে দাবি করেন, সম্প্রতি ঘোষিত ভিসামুক্ত প্রবেশ সুবিধা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করবে। দুই দেশের মধ্যে ফের সরাসরি বিমান চালানো নিয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হয়।
শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা এএফএম খালিদ হোসেনের সাথে সাক্ষাত করে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য বৃত্তি প্রদানের কথা বলেন। পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মোঃ তৌহিদ হোসেনের সাথে এক বৈঠকে পররাষ্ট্র সচিব-পর্যায়ের পরামর্শ এবং যৌথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতো বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়াগুলির কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন মারুফ। এইসব সৌজন্য বৈঠকের মাধ্যমে আসলে পাকিস্তান সম্পর্ক জোরদার করতে চাচ্ছে। যেটা দীর্ঘদিন পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মোড়ের সন্ধান পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনার পতনে পাকিস্তানপন্থী শক্তির হঠাৎ এই উন্মাদনা আগে কখনও দেখা যায়নি। পাকিস্তানপন্থীরা তাই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার কামরান ধাঙ্গল। একই দিনে পাকিস্তানি হাইকমিশনার মোহাজির ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমিটির (বিএমডব্লিউডিসি) সাথেও বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে স্থানীয় বিহারী মুসলিম ছাত্ররা যাতে উর্দু শিখতে পারে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাদের উর্দু শেখার খরচ বহন করবে পাকিস্তানি দূতাবাস। বিহারি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক ভিসা দেওয়া হবে। তাদের ঘন ঘন পাকিস্তানে যেতেও উৎসাহিত করা হবে। ভারতকে আটকাতে পাকিস্তানের মতো পরমানু শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভাব করার কথাও প্রকাশ্যে আলোচিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহীদুজ্জামান সামরিক কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানে ভারতের মোকাবেলায় পাকিস্তানের সাথে সহযোগিতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
সবমিলিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের নতুন অধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি গোটা দুনিয়ার জন্যই নতুন ইস্যু। তবে বাংলাদেশকেও ভাবতে হবে, একাত্তরের গণহত্যার জন্য এখনও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি দেশটি। করেনি ভুল স্বীকার। আমরা কি ওই গণহত্যার কথা পুরোপুরি ভুলে যাব? এই সিদ্ধান্তের কথা আমাদের এখনই ভাবতে হবে।