রাজধানীর বিভিন্ন সংরক্ষিত ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে বিধিনিষেধকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর কিছু পরিদর্শক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
রাজউকের পরিদর্শনে নিষিদ্ধ এলাকায় অনুমোদন বিহীন নিয়ম বহির্ভুত বহুতলভবন নির্মাণে জমি মালিক,ডেভেলপার কোম্পানি, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত হলেও রাজউকের ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ সনের ৩ ধারা ও ৬ ধারায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহনে উদাসীন কর্তৃপক্ষ । সরকারের রাজস্ব আয়, জাতীয়স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজউকের অনুমোদন ফি নকশা (প্লান) পাশ ফি আদায়ে বাধা থাকলেও অবৈধ স্থাপনা নির্মানকারীদের সাথে পরিদর্শকদের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক।
দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে,মৌখিক ভাবে অথবা বা লিখিত নোটিশে রাজউক আইন অনুমোদন বিহীন বহুতলভবন নির্মাণকারীদের উপর কামানের গোলার মত ব্যবহার করেন রাজউকের পরিদর্শক। চলমান নির্মান কাজ বন্ধের ভয় দেখিয়ে এবং আইনি জটিলতার কথা বলে তারা বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। ভুক্তভোগী কয়েকজন নির্মাণ উদ্যোক্তা ও জমির মালিক জানান, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর মৌজার ঢাকা উদ্যান নবীনগর হাউজিং চন্দ্রিমা মডেল টাউন ও বসিলা মৌজার ফিউচার টাউন দয়াল হাউজিং এলাকায় প্রতিনিয়ত বহুতলভবন প্রকল্প চলমান রয়েছে। নিবন্ধন বিহীন অপরিকল্পিত এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব নিয়মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাজউকের এলাকা ভিত্তিক অসাধু কর্মকর্তা প্রথমে পরিদর্শনের নামে রাজউকের অনুমোদন বিহীন বহুতল ভবন নির্মাণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
বহুতল ভবন নির্মানকারীর ভাষ্যমতে, পরিদর্শকের মামলার ভয় নকশা বাতিল উর্ধতন কতৃপক্ষের নাম ভাঙ্গিয়ে হুমকি দিয়ে ভয়ংকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। বহুতল ভবন নির্মানকারীরা ভয়ে তটস্থ হলে বিভিন্ন দালালের মধ্যস্ততায় গোপনে আপোষ রফায় মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। লেনদেনে সুরাহা হলে
পরিদর্শকের শিখানো কথা আর দেখানো পথে চললে ভবন নির্মাণে আর কোনো অসুবিধা হয় না। সূত্র জানায়, অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ বন্ধের নোটিশ বা ভাঙার নির্দেশের ভয় দেখিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে শত কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে । নিয়ম মাফিক অবৈধ লেনদেন ও কর্মকর্তাদের ঘুষ বানিজ্যের কারণে রাজউক তার ঐতিহ্যগত জৌলুশ হারিয়ে পুঁথিগত বাঘ হয়ে দাড়িয়ে আছে। তার হুংকারে বিশেষ করে রাজধানীতে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত এলাকায় এখন আর কেউ রাজউকের অনুমোদনের ভয়ে বহুতল ভবনের নির্মান কাজ বন্ধ রাখে না। আইনগত অনুমোদন পাশকাটিয়ে পরিদর্শকদের সলাপরামর্শে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মান হচ্ছে।
যেখানে রাজউকের আইনসিদ্ধ ভাবে অবৈধ হাউজিং (আবাসন) এলাকায় বহুতল ভবন নির্মানের অনুমোদন দেয়ার কোনো সুযোগ নাই। অবৈধ লেনদেন জায়েজ করতে অনিয়মের নতুন অধ্যায়ের সুচনা করেছেন কতিপয় পরিদর্শক। ভবন নির্মানকারীদের দিয়ে রাজউক বরাবর অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করানো হয়। আবেদনের মুলউদ্দেশ্য অনুমোদন পাওয়া নয়। আইনী জটিলতা সৃষ্টির জন্য আবেদন করানো হয়। আবেদন পত্রকে পুঁজিকরে পরদিন থেকে স্থপনা নির্মান কাজের উদ্বোধন করা হয়। অনুমোদন পাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে আবেদন করার প্রয়োজন ছিল কি? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রাজউকের সাথে ফাজলামোর সামিল নয় কি ? এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের এডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর যেকোনো বিষয়ে আবেদন করা যেতে পারে ! উত্তর পাওয়ার আগে আবেদনের বিষয়ে কর্ম সম্পাদন, আইন লঙ্ঘনের সামিল। রাজউকের অনেক কঠোর আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নাই। প্রয়োগ না করা তাদের দাপ্তরিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন ওই আইনজীবী ।
এ বিষয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর নির্মাণ খাতে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ তাদের কাছেও এসেছে।
অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। শহর পরিকল্পনাবিদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর উন্নয়ন তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থার কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নগর ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্বেগজনক। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর বসিলা এলাকার পরিদর্শক উজ্জ্বল দেবনাথের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাংবাদিকের সাথে কথা বলার দায়িত্ব আমার নয়। আমার প্রধানের সাথে কথা বলেন।
রাজউকের প্রধান পরিদর্শক সাব্বিরের সাথে মোহাম্মদপুর এলাকার অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, আমার দু চার মাস পরপর যাওয়া হয়, কোথায় কি ঘটে আমি ঠিক জানিনা । তবে মোহাম্মদপুরের মানুষ ভালো নয়। আরও কিছু জানতে চাইলে অথারাইজড অফিসারেরর সাথে কথা বলেন। অথারাইজড অফিসার সাঈদা ইসলামের কাছে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আজ কোনে কথা বলতে পারবোনা, অন্য একদিন আসেন, এই বলে চলে যান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে সরাসরি যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রাজউক করর্তৃপক্ষের অবৈধ লেনদেন ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানি বন্ধের জন্য এলাকাবাসি দাবী করেন।